বিনিয়োগের দ্বার খুলছে অর্থনৈতিক অঞ্চল

হবে কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, বাড়তি ৪০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির হাতছানি, বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে ২৭ বিলিয়ন ডলারের, দ্রুত চলছে ২৮ অঞ্চলের কাজ, বেশ কিছু কারখানা উৎপাদন-রপ্তানিও করছে

বিদেশি বিনিয়োগের দ্বার খুলে দিচ্ছে দেশব্যাপী নির্মিতব্য ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল। এসব অঞ্চলে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত থেকে শুরু করে যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, হংকং ও তুরস্কের মতো উন্নত দেশগুলো বিপুল অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) বলছে- দেশের শত অর্থনৈতিক অঞ্চলে হবে কোটি মানুষের কর্মসংস্থান। এতে বাড়তি অন্তত ৪০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় বাড়বে। ইতিমধ্যে এসব জোনে বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। ২৮টি অর্থনৈতিক অঞ্চলে কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। দেশের সর্ববৃহৎ শিল্প সিটি হিসেবে স্বীকৃত বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীতে শিল্প-কারখানা স্থাপনের কাজ চলছে অবিরাম। ইকোনমিক জোনগুলোতে স্থাপিত অনেক কারখানায় ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে উৎপাদন। বাড়ছে রপ্তানিও। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীর আরও ১০টি কারখানা এ বছরের মধ্যে উৎপাদনে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বেজা নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের বিনিয়োগ পরিবেশ আগের চেয়ে অনেক উন্নত। পুরো বিশ্বের নজর কেড়েছে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য     বেজা করোনাকালেও সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করছি- পুরো বাংলাদেশকে পাল্টে দেবে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরী। বাস্তবায়নাধীন এ শিল্পনগরী দেশকে অন্তত ১০০ বছর এগিয়ে নিয়েছে। বেসরকারি খাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ খাতকে প্রসারিত ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বিরামহীন কাজ করছে বেজা। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন-এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এমপির মতে- বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগের উত্তম পরিবেশ বিরাজ করছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন ঢাকায় আসছেন। তারা ব্যবসা স্থানান্তর করতে চান বাংলাদেশে। এর সঙ্গে সক্ষমতা বাড়ছে দেশি বিনিয়োগকারীদেরও।

 

বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন- করোনা-পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ স্থানান্তরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে দরকার বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে রাখা। এ জন্য দরকার অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া। এই অঞ্চলগুলো চালু হলে দেশ সুফল পেতে থাকবে। প্রতিবেশী দেশগুলোতেও অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ টানতে বিশেষ কী দিতে পারবে, সেটিও বিবেচনার বিষয়। বেজা জানায়, গত বছরে অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। বিনিয়োগের জন্য সব সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে পুরোপুরি তৈরি হবে দেশের ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল। বর্তমানে ২৮টি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির কাজ জোরেশোরে চলছে। এরই মধ্যে ৮টি অঞ্চলের বেশ কিছু ইউনিট উৎপাদন শুরু করেছে। এসব অঞ্চলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে ভারত, জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, হংকং, সৌদি আরবসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশ। এ পর্যন্ত তিনটি সরকারি ও ১০টি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১ হাজার ৭৮৫ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। বেজা বলছে, বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপন করা কারখানায় জাম্বো ব্যাগ, কোমল পানীয়, নুডলস, ভোজ্য তেল, টিস্যু পেপার, কাগজ, হ্যাংগারসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। এসব পণ্য ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, ভারত, নেপাল, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, চীন, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ফেব্রিকেটেড স্টিল, মোটরসাইকেলসহ অনেক পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে। অনেক অঞ্চলে স্থাপিত কারখানা ইতিমধ্যে উৎপাদনে রয়েছে। আরও কয়েকটি জোনের শিল্প-কারখানা আগামী বছরের মধ্যে উৎপাদনে যাবে। বেজা জানায়, বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীর ৩০ হাজার একরের বেশি জায়গাজুড়ে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। এই শিল্পনগরী হবে পূর্ণাঙ্গ শিল্প সিটি। এখানে বন্দরসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে। বিদেশি বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলোর জন্য থাকবে পৃথক জেটি। সবুজ শিল্পের বিপ্লব ঘটবে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীতে। এ শিল্পনগরীর দুটি ব্লকের প্রায় ১ হাজার একর জায়গাজুড়ে যেসব শিল্প গড়ে উঠবে এর সবই হবে শতভাগ সবুজ কারখানা (গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি), পরিবেশবান্ধব। এখানকার একেকটি সরোবরের আয়তন হবে ২০০ একর। এটি দেশের শিল্প খাতের জন্য মডেল হিসেবে কাজ করবে। এটিই হবে দেশের সবচেয়ে বড় ইকোনমিক জোন। যার আয়তন ৩৩ হাজার একর। এতে কর্মসংস্থান হবে ১৫ লাখ মানুষের। এ শিল্পনগরী ঘিরে আশপাশের এলাকায়ও গড়ে উঠছে শিল্প-কারখানা। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীর সঙ্গে যুক্ত হবে চট্টগ্রামে নির্মিতব্য বে-টার্মিনাল। এতে সহজ হবে পণ্য আমদানি-রপ্তানি। উৎপাদিত পণ্য সরাসরি রপ্তানি হবে বে-টার্মিনাল দিয়ে। এখন পর্যন্ত এ শিল্পনগরীতে দেশের বিভিন্ন কোম্পানির পাশাপাশি বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছেন জাপান, চীন, ভারত, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিনিয়োগকারীরা। এটি হবে বিস্তৃত শিল্পনগরী। এখানে সব ধরনের ভারী শিল্প স্থাপিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে ব্যাপক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরি হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শিল্পনগরীটির অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ শেষ করতে বদ্ধপরিকর কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের মধ্যে অনেক কোম্পানি উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে। এদিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগের জন্য জমি নিয়েছে বিদেশি বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে জাপানের হোন্ডা মোটর করপোরেশন, দক্ষিণ কোরিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম কোম্পানি এস কে গ্যাস, বিশে^র তৃতীয় বড় ইস্পাত উৎপাদক প্রতিষ্ঠান জাপানের নিপ্পন স্টিল, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে খেলনা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেইগো লিমিটেড, ভারতের আদানি ও সিঙ্গাপুরের উইলমারের যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড, রং উৎপাদনকারী বার্জার ও এশিয়ান পেইন্টস, যুক্তরাজ্যের ইউরেশিয়া গুডস এবং চীনের বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তুরস্কের ফরেন ইকোনমিক রিলেশন বোর্ড অব টার্কির (ডিইআইকে) সভাপতি নেল ওলপাক গত জানুয়ারিতে বিডা আয়োজিত ‘তুরস্ক ও বাংলাদেশ : বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের নতুন যুগ’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনায় বাংলাদেশে নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে বিনিয়োগ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন- তুরস্কের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, তথ্য-প্রযুক্তি, বস্ত্র ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ করতে চায়। সাম্প্রতিক উন্নয়ন বিশ্বে বাংলাদেশকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। যা তুরস্কের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আগ্রহী করে তুলেছে। বেজা সূত্র জানায়- সংস্থাটির গভর্নিং বোর্ড ইতিমধ্যে ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান নির্ধারণ ও জমির পরিমাণ অনুমোদন করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরী, মহেশখালী, শ্রীহট্ট, জামালপুর ও সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক- এই ৫টি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৭০টির অধিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে ৭ হাজার একরের বেশি জমি ইজারা দেওয়া হয়েছে। জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলে তিনটি শিল্পের কারখানা স্থাপনের কাজ চলছে। শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি ইজারা শেষ হয়েছে। শিগগিরই সেখানে শিল্প স্থাপনের কাজ শুরু হবে। সাবরাং ট্যুরিজম পার্কের উন্নয়ন বেশ ত্বরিত গতিতে হচ্ছে। সেখানে ইতিমধ্যে ৩টি হোটেল নির্মাণের ভিত্তি স্থাপন হয়েছে। মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি শিল্প স্থাপনের কাজ চলছে। পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে বিলম্বের কারণে অন্য শিল্প স্থাপনে কিছুটা সময় লাগছে। আশা করা যায়, অতি দ্রুত সেখানেও শিল্প স্থাপনের কাজ শুরু হবে।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানের বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলে ভূমি উন্নয়নের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। জাপান সরকারের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে স্থাপন করা এই ইপিজেডের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ এগোচ্ছে। এখানে শিগগিরই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। আগামী বছরের শেষের দিকে শিল্প স্থাপনের কাজ শুরু হবে।

 

Post a Comment

0 Comments